Bengali Story

 

অর্থপটেরা বর্গভুক্ত কীটপতঙ্গরা

প্রাণীদের মধ্যে কীটপতঙ্গদের সংখ্যাই পৃথিবীতে সর্বাধিক, প্রায় ১০ কোটি। সুতরাং ধরেই নেওয়া যায় এদের মধ্যে বৈচিত্র্যও সর্বাধিক। প্রায় ৯০% মত বিচিত্র কীটপতঙ্গদের দেখা মেলে এই দুনিয়ায়। এদের মধ্যে একটি বিশিষ্ট বর্গ হল অর্থপটেরা, যার অন্তর্ভুক্ত কীটপতঙ্গগুলি হল – গঙ্গাফড়িং বা ঘাসফড়িং, পঙ্গপাল, ঝিঁঝিঁপোকা ইত্যাদি। সারা বিশ্বে এদের প্রায় ২৭০০০ প্রজাতির বিবরণ পাওয়া যায়। তবে প্রতিটি গোষ্ঠীরই সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল- এরা সাধারণত তৃণভোজী। এদের অগ্রডানা জোড়া সরু ও চামড়ার মত আস্তরণ যুক্ত। তবে পশ্চাৎডানা জোড়া বড়, ঝিল্লিময় বা জালিকাকার এবং পাখার মত ভাঁজ করা থাকে, যখন ব্যবহার হয় না। তাই এরা উড়তে সক্ষম। কিন্তু এরা লাফাতে পারে খুব বেশি, কারণ এদের পশ্চাৎ পা জোড়া খুবই লম্বা, মোটা আর পেশিময়। প্রজনন কালে পুরুষ পতঙ্গেরা নিজেদের শরীর থেকে এক ধরণের আওয়াজ সৃষ্টি করে স্ত্রী পতঙ্গদের আকর্ষণ করার জন্যে। এই একটানা আওয়াজ আমাদের কানে ঝিনঝিন করতে থাকে। সেই থেকেই ঝিঁঝিঁপোকা নামটার উৎপত্তি। প্রতিটি গোষ্ঠী সম্বন্ধে অল্প কিছু বর্ণনা দিই।

(১) গঙ্গাফড়িং বা ঘাসফড়িং – পৃথিবীতে প্রায় ২৪০০ গণের মধ্যে ১১০০০ প্রজাতির এই ধরণের ফড়িং পাওয়া যায়। পৃথিবীর ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলেই এদের পাওয়া যায়। প্রায় ৯৯% প্রজাতিই তৃণভোজী। এরা দৈর্ঘ্যে কয়েক মিলিমিটার থেকে ১৫ সেন্টিমিটার অবধি হয়ে থাকে। এরা পৃথিবীতে প্রায় ২৫০ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ কিনা প্রাক-ট্রায়াসিক যুগে এসেছে। মুখে থাকে শক্ত চোয়াল আর দাঁত। এর ফলে গাছের পাতা কেটে খেতে সুবিধে হয়। গায়ের রঙ সহজেই ছদ্মবেশ ধারনে সাহায্য করে। অল্প সময়ের মধ্যেই এরা ঝোপঝাড় খেয়ে শেষ করে ফেলে। বর্ষাকালে এদের সংখ্যাধিক্য ঘটে। এদের শরীরে অসম্পূর্ণ রূপান্তর দেখা যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা জন্মানোর পর সেগুলি প্রায় ৪-৫ বার খোলস নির্মোচনের পর পূর্ণরূপ ধারণ করে। এদের দেহের অগ্রপদ জোড়ায় টিবিয়া নামক অঙ্গে টিমপ্যানি নামক অঙ্গ থাকে যা কানের পর্দার কাজ করে। পা দুটি কে ডানায় ঘষে ঘষে একটানা কম্পন যুক্ত শব্দ সৃষ্টি করে। এটি এদের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এই পতঙ্গেরা ময়না পাখিদের প্রিয় খাদ্য। আর মেক্সিকো এবং ইন্দোনেশিয়ার মানুষদেরও খাদ্য এরা। তবে এরা খুব সহজেই পরজীবী দ্বারা এবং রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়। স্ত্রী পতঙ্গের দেহে ডিম্বাশয় থাকার দরুন এরা একটু লম্বা হয় দৈর্ঘ্যে। সাধারণতও দু’ধরণের গঙ্গাফড়িং বা ঘাসফড়িং পাওয়া যায়ঃ-

(ক) ছোট শুঁড়যুক্ত গঙ্গাফড়িং – দুনিয়ায় প্রায় ১০০০ এরও বেশী প্রজাতির দেখা মেলে । এরা সাধারণত একলাই ঘুরে বেড়ায় । কিন্তু কখনো কখনো প্রয়োজন পড়লে এরা দলবদ্ধ ভাবেও কার্যসিদ্ধি করে। যখন কোন জায়গায় খরা দেখা দেয় বা খাদ্যাভাব ঘটে, তখনি এদের মস্তিষ্ক থেকে সেরোটোনিন নামক হরমোন ক্ষরিত হয় এবং এদের শরীরে নাটকীয় ও খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। দেখা যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অসংখ্য গঙ্গাফড়িং জন্মে গেছে। তারপর এরা ঝাঁকে ঝাঁকে খাদ্যের উৎসে উড়ে যায় এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। এদের তখন বলা হয় পঙ্গপাল। পঙ্গপালের দল এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় পরিযান করে থাকে। প্রয়োজনে এরা দেশান্তরীও হয়। মরুভূমির পঙ্গপালেরা সবথেকে বেশী দূরত্ব পরিযান করে। এরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মানুষের প্রভূত ক্ষতি করে। শুধু তাই নয়, ইতিহাস বলে এরাই নাকি প্লেগ রোগ সৃষ্টিকারী। প্রাচীন মিশরীয় ইতিহাসেও এদের উল্লেখ আছে রোগ সৃষ্টির ব্যাপারে। আফ্রিকা, মধ্য ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়াতে গত শতকে প্লেগ ছড়ানোর জন্য এরাই দায়ী। ১৯০৮ সালের প্লেগে শেষ বারের মত “বম্বে পঙ্গপালের” দেখা পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে। এখন উন্নত প্রযুক্তির দ্বারা এদের অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছে। জৈব নিয়ন্ত্রণ দ্বারা অর্থাৎ, পরজীবী দেহে ঢুকিয়ে এদের মেরে ফেলা হয়। প্রাণীবিদ্যার বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজে এদের ব্যবচ্ছেদ করা হয়। এছাড়াও এদেরকে আফ্রিকান, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষেরা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেন। পঙ্গপালেরা ডিম পাড়ে মাটিতে, প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টা এবং সেগুলি আঠা জাতীয় পদার্থ দ্বারা লেপটে থাকে। এই ডিম গুলি ফুটতে অনেক সময় লাগে অর্থাৎ, সুপ্ত অবস্থায় থাকে। শীতকালে এবং গ্রীষ্মকালে ডিম ফুটতে দেরি হওয়ার কারণ যথাক্রমে “শীতঘুম” এবং “গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপন”।

(খ) লম্বা শুঁড়যুক্ত গঙ্গাফড়িং – পৃথিবীতে এই ধরণের পতঙ্গের প্রায় ৬৮০০ রকমের প্রজাতি বর্তমান। সাধারণত এদের শুঁড় দেহের থেকে আয়তনে অনেক বড় হয়। ব্রিটিশরা এদেরকে  “ঝোপঝাড়ের ঝিঁঝিঁ” বললেও, আমেরিকানরা “ক্যাটিডিড” বলেন। এরা সাধারণত আকারে বড়, চ্যাপ্টা আর সবুজ রঙের হয়। গাছের পাতার সাথে এমন ভাবে মিশে থাকে যে বোঝাই যায় না। সেই জুরাসিক আমল থেকে এরা পৃথিবীতে আছে কারণ, এরা অনুকৃতি এবং ছদ্মবেশ ধারণে বেশ পটু। এরা ছোট শুঁড়যুক্ত গঙ্গাফড়িংদের মত দিনের বেলায় নয়, রাত্রি বেলায় বেরোয় অর্থাৎ, এরা নিশাচর। বেশীরভাগ প্রজাতিই তৃণভোজী, তবে মাংসাশীরাও অনেক আছে এবং তারা সব ধরণের প্রাণীই খেয়ে থাকে। ভারতে এদের বেশী দেখা যায় বর্ষায়। প্রজনন কালে পুরুষ পতঙ্গেরা এত শব্দ উৎপাদন করে যে কানে তালা পড়ে যায়। এদের শরীরেও অসম্পূর্ণ রূপান্তর লক্ষণীয়। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশেই এদের দেখা মেলে। শুধুমাত্র আমাজন অববাহিকাতেই প্রায় ২০০০ প্রজাতির বসবাস। আফ্রিকার উগান্ডা  দেশের ও তার পার্শ্ববর্তী কিছু অঞ্চলের মানুষেরা এদের খেয়ে থাকেন। “মরমন ঝিঁঝিঁপোকা” ই একমাত্র ফসল ক্ষতিকারক প্রজাতি।

(২) ঝিঁঝিঁ পোকা – এবার আসি ঝিঁঝিঁ পোকাদের কথায়। পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চল জুড়ে প্রায় ৯০০ প্রজাতির ঝিঁঝিঁপোকা দেখা যায়। এরা প্রায় সর্বক্ষণই ঝিঁঝিঁ করে যায় এবং খুব সুন্দর ভাবে মাটি খোঁড়ে। ঘরেও যেমন এরা থাকে, তেমন আবার মাঠে ঘাটেও চরে বেড়ায়। প্রায় নলাকার পুরুষ দেহে শব্দ উৎপাদনকারী অঙ্গটি ঠিক অগ্র জোড়া পায়ে লুকিয়ে থাকে। অগ্র ডানা দ্বয়ের ঘর্ষণের মাধ্যমে এরা শব্দ উৎপন্ন করে। স্ত্রী দেহে ডিম্বাশয়টি যথারীতি লম্বা। অগ্র ডানা জোড়া বেশ পুরু চামড়ার মত আবরণ যুক্ত আর পশ্চাৎ ডানা দ্বয় পাতলা জালিকাকার। তবে কয়েকটি প্রজাতি কিন্তু নীরব। এরা বেশীরভাগই নিরামিষাশী, গাছের শিকড়বাকড় খায়। তবে এদেরকে ভেজে খায় মূলত দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বাসিরা, যেমন কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের বাসিন্দারা। চীনা এবং জাপানীরা এদের পোষেন আর চীনারা এই পোষা পতঙ্গগুলিকে দিয়ে লড়াই এর খেলা খেলান।

এইজ ঝিঁঝিঁপোকাদের মধ্যে আরেক ধরণের প্রজাতি পাওয়া যায়, যাদের আমরা বলে থাকি “ছুঁচো ঝিঁঝিঁ” বা “ঘুরঘুরে পোকা”। এদের অগ্রপদ জোড়া বেশ বড় আর আকারে অনেকটা মাটি খোঁড়ার বেলচা ও নিড়ানির মত। এর সাহায্যে এরা সহজেই মাটি খুঁড়ে তার ভেতরে বাসা বানাতে পারে। লম্বা সুড়ঙ্গ বানায় আর তার ভেতরেই ডিম পেড়ে বাচ্চা পালন করে। এদের দৈর্ঘ্য দেড় থেকে দু’ইঞ্চি এবং বাদামি রঙের দেহ। এরা সর্বভুক এবং নিশাচর। অনেক সময় আমাদের বাড়ির আলোতে আকৃষ্ট হয়ে এরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরা কিন্তু প্রয়োজনের সময় ফসলের ক্ষতিও করতে পারে। সাধারণত এরা মাটিতেই ঘোরাফেরা করে, খুব বেশি একটা ওড়ে না। কিন্তু প্রজনন কালে পুরুষ পতঙ্গেরা অনেক দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম, আবার এরা সাঁতারও কাটতে পারে।

সুতরাং দেখাই যাচ্ছে আমাদের বাসভূমি বৈচিত্র্যময় কীটপতঙ্গে ভরা। আমরা যদি একটু চেষ্টা করি প্রকৃতিকে বাঁচানোর, তাহলে বোধহয় এরাও ভালো থাকে আর পৃথিবীর ভারসাম্যও বজায় থাকে।

 

Author: Shruti Maity
Contribution Date: Jun 26, 2018.

সূত্রধরঃ-

  1. INSECTS, M. S. MANI, National Book Trust
  2. A CONCISE GUIDE TO INSECTS, Patrick Hook, Parragon Books
  3. WIKIPEDIA & GOOGLE
_____________________________________________________